Wednesday, July 28, 2021
Homeকৃষি ব্যবসাচাষের জন্য 'জৈব সার' কিভাবে তৈরি করবেন!

চাষের জন্য ‘জৈব সার’ কিভাবে তৈরি করবেন!

আমাদের দেশে চাষ আবাদের জন্য ‘জৈব সার’ এর ব্যবহার দিনের পর দিন বাড়ছে। কেননা, জৈব সার তৈরি হয় জৈব পদার্থ থেকে। জৈব পদার্থ হলো গাছপালা ও জীবজন্তুর মৃতদেহ যখন পচে গিয়ে যে পদার্থের সৃষ্টি হয়। আর জৈব পদার্থকেই রূপান্তরিত, প্রক্রিয়াজাত ও সংগৃহীত করে এই জৈব সার বানানো হয়। তাই এই জৈব সার মাটির ভালো স্বাস্থ্যের জন্য খুবই প্রয়োজন।

জৈব সারের উদাহরণ যেমন গোবর সার, খৈল, সবুজ সার ইত্যাদি। জৈব সারে গাছের পুষ্টি ও বেড়ে উঠার সমস্ত উপাদান পাওয়া যায়।

জৈব সারের প্রকারভেদ

জৈব সার তিন ধরনের হয়। যেমন –

শুকনো

শুকনো জৈব সার প্রায়ই মাটিতে মিশে যায়। এগুলি বাগান ও পাত্রে জন্মানো উদ্ভিদ দুই ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা যেতে পারে। এই ধরনের সার সাধারণত চারা তৈরি করতে, চারা রোপণ করার সময় ও গাছের বৃদ্ধিকে বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হয়।

তরল

এই সার গুলি তরল আকারে গাছকে পুষ্টি দেয়। এরা উদ্ভিদের শিকড় দ্বারা শোষিত হয়। এই সার গুলি গাছের চারপাশে ঢেলে দেওয়া হয় বা অনেক সময় পাতায় স্প্রে করাও হয়। স্প্রে দিলে শাকসবজির মরসুমে তাদের বাড়তে অনেক সহায়তা করে।

তরল সার উদ্ভিদের বৃদ্ধির জন্য সব চেয়ে ভালো ও সক্রিয় হিসেবে বিবেচিত হয়। সাধারণত মাসিক ভিত্তিতে এই সার প্রয়োগ করা হয়। পাতা জাতীয় উদ্ভিদের ক্ষেত্রে এটা ১৫ দিন অন্তরেও হতে পারে।

বৃদ্ধি বর্ধক

এগুলোকে প্রকৃত অর্থে সার বলা যায় না। এগুলো হল একরকমের পদার্থ যা গাছগুলিকে প্রাপ্ত পুষ্টি শুষে নিতে সহায়তা করে। এদের মধ্যে অন্যতম হল ক্যাল্প, যা খুবই সক্রিয়। তবে স্বাস্হ্যকর মাটিতে যেহেতু জীবাণু, এনজাইম ও হিউমিক অ্যাসিডের মতো সহায়ক পদার্থ থাকে, তাই এই বৃদ্ধি বর্ধক উপাদানের উপর আপনি নাও খরচা করতে পারেন।

জৈব সার তৈরি করার নিয়ম

আপনি যদি জৈব সার প্রক্রিয়া করণ করে বাজার জাত করতে চান, সেক্ষেত্রে FCO (ফার্টিলাইজার কন্ট্রোল অর্ডার) এর কিছু নির্দেশাবলী আছে। যেগুলো মেনে আপনাকে এটি বানাতে হবে। কম্পোজিশন এইভাবে থাকতে হবে।

  • আর্দ্রতা % ( ওজন সাপেক্ষে) : ১৫.০ – ২৫.০
  • রং : গাড়ো বাদামি থেকে কালো
  • গন্ধ : দুর্গন্ধ থাকা চলবে না
  • মোট জৈব কার্বন (ওজন সাপেক্ষে): সর্বনিম্ন ১২.০
  • মোট নাইট্রোজেন (N) (ওজন সাপেক্ষে) : সর্বনিম্ন ০.৮
  • মোট ফসফেটস (P2O5) (ওজন হিসেবে) : সর্বনিম্ন ০.৪
  • মোট পটাশ (K2O) (ওজন হিসেবে): সর্বনিম্ন ০.৪
  • C:N অনুপাত : <২০
  • pH ৬.৫ – ৭.৫
  • পরিবাহিতা ( dsm – 1) : ৪.০ এর বেশি নয়।
  • প্যাথোজেনস : নেই
  • বাল্ক ঘনত্ব (জি/সেমি3) < ১.০
  • কণার আকার : সর্বনিম্ন ৯০% । উপাদানগুলো ৪.০ মিমি আইএসের চালুনির মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

ভারী ধাতব সামগ্রী, (মিলিগ্রাম/কেজি হিসেবে) সর্বোচ্চ –

  • আর্সেনিক (As2O3) : ১০.০০
  • ক্যাডমিয়াম(Cd) : ৫.০০
  • ক্রোমিয়াম(Cr) : ৫০.০০
  • তামা(Cu) : ৩০০.০০
  • মার্কারি(Hg) : ০.১৫
  • নিকেল(Ni) : ৫০.০০
  • সীসা(Pb) : ১০০.০০
  • দস্তা (Zn) : ১০০০.০০

জৈব সার তৈরির পদ্ধতি

জৈব সার তিনটি পদ্ধতিতে তৈরি করা যায়। সেগুলো হল – (১) সিটি কম্পোস্ট জৈব সার (২) প্রেসমাড (৩) ভার্মি কম্পোস্ট

(১) সিটি কম্পোস্ট জৈব সার

মাইক্রোবিয়াল রূপান্তর প্রক্রিয়াটির মাধ্যমে আপনি বায়োডিগ্রেডেবেল শহরের বর্জ্য থেকে এই কম্পোস্ট টি তৈরি করতে পারবেন। এটি মাটির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। এই জৈব সারের ব্যাকটেরিয়া গাছগুলিতে বায়ুমন্ডলে উপস্থিত নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের উপলব্ধতা করতে সাহায্য করে। এবং, উদ্ভিদের পুষ্টি ও বৃদ্ধিতে ব্যাপকভাবে সাহায্য করে।

(২) প্রেসমাড

আখ শিল্প বা চিনি শিল্পে আখ থেকে রস বের করে নেওয়ার পর যে অবশিষ্ট অংশ পড়ে থাকে, তার থেকে এই জৈব সার তৈরি করা হয়। আখ শিল্পে প্রচুর পরিমাণে এই অবশিষ্টাংশ বা মাড পাওয়া যায় এবং তা নিষ্পত্তি করা একটা বড়ো সমস্যা। কিন্তু তা থেকে সার তৈরি করে সহজেই আমরা মাটিতে প্রয়োগ করতে পারি এবং মাটির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে পারি।

(৩) ভার্মি কম্পোস্ট

ভার্মি কম্পোস্ট হল একটি পদ্ধতি যার দ্বারা কৃমি জাতীয় জীবের দ্বারা জৈব পদার্থ ভক্ষণ ও হজম করা হয় এবং তা মলত্যাগের মাধ্যমে একটি উপকারি উপাদানে পরিণত করে, যা মাটির জন্য খুবই উপকারী। কেঁচো এই জৈব পদার্থকে গ্রাস করে এবং মলত্যাগ করে ভার্মি কম্পোস্ট দেয়।

ভার্মি কম্পোস্ট গাছগুলিতে পুষ্টি ও বৃদ্ধি বর্ধনকারী হরমোন সরবরাহ করে। এছাড়াও, এটি মাটির কাঠামো উন্নত করে যার ফলে মাটির জল ও পুষ্টি ধারণের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। জানা গিয়েছে ফল, ফুল ও শাকসবজি জাতীয় উৎপাদনে ভার্মি কম্পোস্টের ব্যবহারে খুব ভালো ফলাফল পাওয়া গেছে।

ভার্মি কম্পোস্ট
ভার্মি কম্পোস্ট

জৈব সার প্রস্তুত প্রণালী

নানাভাবে এই সার তৈরি করা যায়।আসুন জেনে নিই এই সার বানানোর প্রস্তুত প্রণালী –

খৈল থেকে জৈব সার

সরিষা, তিল, তিসি, বাদাম, ভেরেন্ডা, নারকেল ইত্যাদি তেল জাতীয় বীজ ঘানি বা ইম্পেলারের মাধ্যমে পেষাই করার পর যে অবশিষ্টাংশ পড়ে থাকে তাকে আমরা খৈল বলে থাকি। এই খৈলে অন্যান্য উপাদানের সাথে সাথে নাইট্রোজেন সারও পাওয়া যায়।

পচা গোবর , কাঠের গুঁড়ো ও খৈল ৪:২:১ অনুপাতে মেশাতে হবে। মানে, ৪ ভাগ পচা গোবর, ২ ভাগ কাঠের গুঁড়োর সাথে ১ ভাগ খৈল ভালোভাবে মিশিয়ে নিতে হবে। এরপর এর মধ্যে হালকা জল দিয়ে মিশ্রণটি এমনভাবে তৈরি করতে হবে যেন ওই মিশ্রণ থেকে গোলা করে একটি বল বানিয়ে বলটি মাটিতে ফেললে যেন ভেঙ্গে না যায় আবার মাটির সাথে লেপ্টে না যায়। এরপর মিশ্রণটি একটি স্তূপাকারে জমা করতে হবে। স্তূপটির পরিমাণ ৩০০ থেকে ৪০০ কেজি হলে সব থেকে ভালো। শীতকাল হলে স্তূপের উপর চটের বস্তা ঢেকে দিতে হবে।

স্তূপটি তৈরি করার ৩ দিনের মধ্যে এর তাপমাত্রা ৬০০-৭০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড পৌঁছয়। স্তূপে বেশি তাপমাত্রা অনুভূত হলে একে উলট পালট করে ঠান্ডা করতে হবে। তারপর আবার স্তূপ বানিয়ে ছেড়ে দিতে হবে। তাপমাত্রা বেশি মনে হলে এর সাথে পুনরায় খৈল ও পচা গোবর সমপরিমাণ মিশিয়ে যোগ করতে হবে। এই ভাবে ২-৩ দিন ছাড়া ছাড়া ওলট পালট করতে হবে। এভাবে করলে ২০-২৫ দিনের মধ্যে এই সার তৈরি হয়ে যাবে। স্তূপটি ছায়াযুক্ত উঁচু জায়গায় করতে হবে এবং এর নিচে পলিথিন শীট বিছিয়ে দিতে হবে।

আরও পড়ুন : ‘মাশরুম চাষের’ ব্যবসা করে প্রতি মাসে রোজগার লাখ টাকা

আখের ছোবড়া

আখ শিল্পে আখ থেকে পেষাই করে রস বের করে নেওয়ার পর যে আখের ছোবড়া পড়ে থাকে, তা সংগ্রহ করে তার থেকে জৈব সার বানানো যায়। যেহেতু, আখের ছোবড়া পচন প্রক্রিয়া খুব ধীরে, তাই এর থেকে জৈব সার তৈরি হতে অনেক সময় লাগে। তবে এই জৈব সারে অধিক মাত্রায় কার্বন ও নাইট্রোজেন পাওয়া যায়।

এক্ষেত্রে আখের ছোবড়ার গাদা বানাতে হবে। ২ -৩ মিটার চওড়া কোনো স্হানে আখের ছোটো ছোটো টুকরো গুলো জড়ো করে পা দিয়ে জেঁকে জেঁকে ৩০ সেমি উঁচু গাদা বানাতে হবে। এরপর এর সাথে ছাই, গোবর, পুকুরের তলার কাদা বা পাঁক মেশাতে হবে। এইভাবে ৫-৬ টি গাদা পরপর সাজিয়ে একটি স্তূপ বানাতে হবে। প্রতি মাসে একবার করে উলট পালট করে নতুন গাদা বানাতে হবে। এইভাবে প্রায় ৫ মাসে এর থেকে এই সার তৈরি হয়।

হাঁস মুরগি বা গরুর বিষ্ঠা

হাঁস, মুরগী, গরু বা যে কোনো গৃহপালিত পশুর বিষ্ঠা থেকে এই জৈব সার তৈরি করা হয়। হাঁস মুরগির ঘরে পুরু বিছানা তৈরি করা হয় খড়, পাতা ও কাঠগুঁড়ো দিয়ে। এর উপর প্রতিদিন হাঁস মুরগি বিষ্ঠা ত্যাগ করে। সেই বিষ্ঠা কোনো গর্তে জমিয়ে প্রতি সপ্তাহে উলট পালট করলে এক মাসের মধ্যে এই সার ব্যবহার করা যায়।

এছাড়াও হাড়ের গুঁড়ো, মাছের গুঁড়ো ও ছাই থেকে ও জৈব সার বানানো যায়।

জৈব সার ব্যবহারের উপকারিতা

আমাদের পরিবেশের মাটিতে ২-৩% এর ও কম জৈব পদার্থ আছে কিন্তু এই মাত্রা ৩-৫ % এর মতো হওয়া উচিত। তাই আমাদের এই সার ব্যবহার করে এই মাত্রা বাড়ানো উচিত। এছাড়াও যে সমস্ত কারণে আমাদের জৈব সার ব্যবহার করা উচিত তা হল-

  • মাটির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে। মাটির গঠন উন্নত করে।
  • মাটিতে থাকা উপকারী জীবাণুদের বাড়তে সাহায্য করে।
  • মাটির তাপমাত্রা বজায় রাখে।
  • মাটির রস ধরে রাখে। এজন্য অধিক জলসেচের দরকার পড়ে না।
  • পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।

Source : Internet

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular